Top News

ইরান যুদ্ধের ব্যয় আরব দেশগুলোর ওপর চাপাতে চান ট্রাম্প

 

সংবাদ সম্মেলনে বক্তব্য দিচ্ছেন হোয়াইট হাউসের প্রেস সেক্রেটারি ক্যারোলিন লেভিট। ৩০ মার্চ, হোয়াইট হাউস, ওয়াশিংটন ডিসিছবি: রয়টার্স

নিউজ ডেস্ক : মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরানের বিরুদ্ধে চলমান সামরিক অভিযানের বিপুল ব্যয় মধ্যপ্রাচ্যের আরব দেশগুলোর ওপর চাপানোর পরিকল্পনা করছেন বলে ইঙ্গিত দিয়েছে হোয়াইট হাউস। প্রশাসনের বক্তব্য ও সাম্প্রতিক পরিস্থিতি বিশ্লেষণে ধারণা করা হচ্ছে, যুক্তরাষ্ট্র এবার সরাসরি মিত্র দেশগুলোর কাছ থেকে আর্থিক সহায়তা চাওয়ার পথে এগোতে পারে।

হোয়াইট হাউসের প্রেস সেক্রেটারি ক্যারোলিন লেভিট জানিয়েছেন, প্রেসিডেন্ট বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে বিবেচনা করছেন এবং প্রয়োজন হলে আরব দেশগুলোর প্রতি আহ্বান জানাতে পারেন। তাঁর বক্তব্যে স্পষ্ট, যুদ্ধের ব্যয় ভাগাভাগির বিষয়টি এখন নীতিনির্ধারণী আলোচনার অংশ হয়ে উঠেছে এবং এটি ভবিষ্যতে বাস্তব রূপ নিতে পারে।

বিশ্লেষকদের মতে, এই ধারণার পেছনে রয়েছে ১৯৯০ সালের উপসাগরীয় যুদ্ধ-এর অভিজ্ঞতা। সে সময় কুয়েতকে ইরাকের দখল থেকে মুক্ত করতে যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বে পরিচালিত অভিযানে জার্মানি, জাপানসহ একাধিক দেশ বড় অঙ্কের অর্থ সহায়তা দিয়েছিল। সেই মডেল অনুসরণ করেই এবারও যুক্তরাষ্ট্র তার সামরিক ব্যয়ের একটি অংশ মিত্র দেশগুলোর ওপর চাপানোর কথা ভাবছে বলে মনে করা হচ্ছে।

তবে বর্তমান পরিস্থিতি ভিন্ন। এবার যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল একতরফাভাবে ইরানের বিরুদ্ধে সামরিক অভিযান শুরু করেছে বলে বিভিন্ন মহলে আলোচনা রয়েছে। ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু-এর প্রভাবেই এই অভিযানের সূচনা হয়েছে বলে অনেক বিশ্লেষক মনে করছেন। ফলে আরব দেশগুলো এই যুদ্ধে কতটা সম্পৃক্ত হবে বা অর্থনৈতিকভাবে সহায়তা দেবে কি না, তা এখনো অনিশ্চিত।

এদিকে মার্কিন প্রশাসনের ঘনিষ্ঠ বিশ্লেষক শন হ্যানিটি মত দিয়েছেন, সম্ভাব্য যেকোনো যুদ্ধবিরতি চুক্তির অংশ হিসেবে ইরানকেই এই যুদ্ধের সম্পূর্ণ ব্যয় বহন করতে বাধ্য করা উচিত। তাঁর মতে, তেলের মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্রকে ক্ষতিপূরণ দেওয়া যেতে পারে।

যুদ্ধের ব্যয় ইতোমধ্যে দ্রুত বেড়ে চলেছে। মার্কিন গণমাধ্যমের তথ্য অনুযায়ী, যুদ্ধের প্রথম ছয় দিনেই প্রায় ১ হাজার ১৩০ কোটি ডলার ব্যয় হয়েছে। ওয়াশিংটনভিত্তিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর স্ট্র্যাটেজিক অ্যান্ড ইন্টারন্যাশনাল স্টাডিজ-এর হিসাবে, ১২তম দিনে এই ব্যয় বেড়ে দাঁড়ায় প্রায় ১ হাজার ৬৫০ কোটি ডলারে। বর্তমানে যুদ্ধ এক মাসের বেশি সময় ধরে চলমান থাকায় মোট ব্যয় আরও অনেক বেশি হয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

এই প্রেক্ষাপটে যুক্তরাষ্ট্র কংগ্রেসের কাছে অতিরিক্ত ২০ হাজার কোটি ডলারের সামরিক বাজেট চেয়েছে, যা যুদ্ধের দীর্ঘস্থায়িত্ব এবং ব্যয়ের ব্যাপকতা ইঙ্গিত করে। একই সঙ্গে এই যুদ্ধ বৈশ্বিক অর্থনীতিতেও চাপ সৃষ্টি করছে।

বিশেষ করে ইরান কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালি কার্যত বন্ধ করে দেওয়ার পর বিশ্বজুড়ে জ্বালানি সরবরাহে বড় ধরনের প্রভাব পড়েছে। এর ফলে আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম বেড়ে গেছে এবং বিভিন্ন দেশে জ্বালানির মূল্য বৃদ্ধি পেয়েছে।

আমেরিকান অটোমোবাইল অ্যাসোসিয়েশন-এর তথ্য অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্রে প্রতি গ্যালন পেট্রলের গড় মূল্য এখন প্রায় ৪ ডলার, যা যুদ্ধ শুরুর আগের তুলনায় এক ডলারের বেশি বৃদ্ধি পেয়েছে। যদিও হোয়াইট হাউস বলছে, এই মূল্যবৃদ্ধি সাময়িক এবং দীর্ঘমেয়াদে ইরানকে দুর্বল করার কৌশলগত সুবিধা এর চেয়ে বেশি হবে।

অন্যদিকে ইরান দাবি করেছে, তারা কোনো আগ্রাসী পদক্ষেপ নেয়নি; বরং কূটনৈতিক আলোচনার মধ্যেই তাদের ওপর হামলা চালানো হয়েছে। তেহরানের ভাষ্য অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলার জবাব হিসেবেই তারা মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন স্থানে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালাচ্ছে।

তবে যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্ররা অভিযোগ করছে, ইরানের এসব হামলায় সামরিক স্থাপনার পাশাপাশি বেসামরিক অবকাঠামো যেমন হোটেল, বিমানবন্দর এবং জ্বালানি স্থাপনাও ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে, যা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলছে।

সব মিলিয়ে, ইরান যুদ্ধ এখন কেবল সামরিক সংঘাতের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই; এটি অর্থনৈতিক চাপ, জ্বালানি সংকট এবং কূটনৈতিক উত্তেজনার একটি জটিল রূপ ধারণ করেছে। এর মধ্যে যুক্তরাষ্ট্র যদি আরব দেশগুলোর ওপর যুদ্ধের ব্যয় চাপানোর উদ্যোগ নেয়, তাহলে তা মধ্যপ্রাচ্যের রাজনৈতিক ভারসাম্যে নতুন চাপ সৃষ্টি করতে পারে। এখন দেখার বিষয়, আরব দেশগুলো এই আহ্বানে সাড়া দেয় কি না এবং এর ফলে বৈশ্বিক রাজনীতিতে কী ধরনের পরিবর্তন আসে।



Post a Comment

Previous Post Next Post